মূল্যস্ফীতি আবারো নয় শতাংশ ছাড়াল ১০ মাসে সর্বোচ্চ

ফেব্রুয়ারিতে আবারো ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি। টানা চার মাসের ঊর্ধ্বগতিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাবেই মূল্যস্ফীতিতে এ চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ২০২৫ সালের শেষ দুই মাস থেকে বাড়তে শুরু করা মূল্যস্ফীতি এ নিয়ে টানা চার মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

বিবিএসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এর মধ্যে অক্টোবরে সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা গেলেও গত বছরের নভেম্বর থেকে আবারো বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৪৯ এবং নতুন বছরের প্রথম মাসে (জানুয়ারি) এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, টানা পাঁচ মাস নিম্নমুখী থাকার পর ফেব্রুয়ারিতে বৈশ্বিকভাবে গম, ভোজ্যতেল ও মাংসসহ প্রায় সব খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বিশ্ববাজারের এ প্রবণতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিতেও। ফেব্রুয়ারির বাজারে খাদ্যপণ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বেড়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলসহ জ্বালানি তেল সরবরাহে ব্যাঘাত তৈরি করছে, যা আগামীতে দামের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। জানুয়ারিতে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। টানা পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।

বিবিএসের তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারিতে গ্রামাঞ্চলের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ এবং শহরে ৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। জানুয়ারিতে গ্রামে ও শহরে মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬৩ ও ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

গত তিন বছর ঊর্ধ্বমুখী বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ের মধ্যে দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যা আগের ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা। তবে দায়িত্ব নেয়ার প্রথম বছরে ১০ শতাংশের নিচে নামাতে পারেনি সরকার, বরং বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

বিবিএসের দেয়া মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঠিকতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সঠিক তথ্যের বিপরীতে সরকারের পছন্দসই প্রতিবেদন প্রকাশ করার বিস্তর অভিযোগ ছিল সংস্থাটির বিরুদ্ধে। এখনো সে সংস্কৃতি থেকে পরিসংখ্যান সংস্থাটি বের হতে পারেনি বলে মনে করেন ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিবিএস যে তথ্য দিচ্ছে সেটি প্রকৃত মূল্যস্ফীতির চিত্র নয়। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি অতীতের মতোই মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার বিবিএসের দেখানো তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি।’

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে অন্তর্বর্তী সরকার নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করে। তবে কেবল নীতি সুদহার বাড়িয়ে চাহিদার লাগাম টেনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারও বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সিন্ডিকেট ভাঙা কিংবা চাঁদাবাজি বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে শুনিনি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানির যে সংকট শুরু হয়েছে, তাতে পরিবহন ব্যয় অনেক বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামও বাড়বে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে না।’

এদিকে বিবিএস বলছে, সংস্থাটি দেশের ৬৪ জেলার ১৫৪টি হাটবাজারের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির গড় সূচক ১২৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

আরও